
কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন, কেউ বিপদে সাহায্য চাইছেন, কোথাও মানুষ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এমন দৃশ্য এখন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ক্যামেরা চালু হচ্ছে, ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে, দর্শক ও মন্তব্য বাড়ছে। কিন্তু বিপদগ্রস্ত মানুষটি প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন কি না, সেই প্রশ্ন প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। মানুষের দুর্দশা কি তবে সহমর্মিতার আহ্বান নয়, দর্শক টানার উপকরণ হয়ে উঠছে?
প্রযুক্তি অন্যায় প্রকাশ, অপরাধের প্রমাণ সংরক্ষণ ও জনমত গঠনের সুযোগ তৈরি করেছে। তাই ঘটনা ধারণ করা নিজে অপরাধ নয়। কিন্তু সাহায্যের বদলে ক্যামেরা, সমাধানের বদলে প্রচার এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তার বদলে দর্শকসংখ্যা যখন অগ্রাধিকার পায়, তখনই মানবিকতার সংকট স্পষ্ট হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির প্রথম প্রয়োজন চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তা। অথচ কখনো প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশ সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে দৃশ্য ধারণে ব্যস্ত থাকেন। কেউ ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। অথচ জরুরি সেবায় খবর দেওয়া কিংবা নিরাপদে সহায়তা করাই তখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ। ঘটনা ধারণ করা যায়, কিন্তু তাতে মানুষের বিপদ কাটে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মনোযোগ নির্ভর সংস্কৃতি এ প্রবণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। বেশি দর্শক ও প্রতিক্রিয়ার আকাঙ্ক্ষায় মানুষের কান্না, অসহায়ত্ব, অপমান ও ব্যক্তিগত বিপর্যয়ও কনটেন্টে পরিণত হচ্ছে। ভুক্তভোগীর সম্মতি, মর্যাদা ও গোপনীয়তা হারাচ্ছে গুরুত্ব। বিশেষ করে শিশু, নারী ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ তাদের জন্য নতুন সামাজিক বিড়ম্বনা তৈরি করতে পারে। জনস্বার্থে অপরাধ বা অনিয়ম প্রকাশ করা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অন্যায় তুলে ধরা আর কারো দুর্দশাকে প্রচারের পণ্য বানানো এক বিষয় নয়। কোনো ঘটনার প্রমাণ সংরক্ষণ জরুরি হলেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভুক্তভোগীর মুখ, পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্ত ছড়িয়ে দেওয়ার নৈতিক অধিকার কারো নেই।
এই সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করার দায় দর্শকেরও। যাচাই ছাড়া ভিডিও শেয়ার, অপমানজনক মন্তব্য কিংবা বিপর্যয় নিয়ে হাস্যরস এসব আচরণ ভুক্তভোগীর সংকট আরও বাড়ায়। প্রতিটি ক্লিক ও শেয়ার তাই দায়িত্বশীলতার দাবি রাখে। কোনো দৃশ্য সামনে এলেই তা প্রচার করা জরুরি নয়; বরং ভাবতে হবে, এর মাধ্যমে জনস্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, নাকি কারো অসহায়ত্বকে পুঁজি করা হচ্ছে।
কনটেন্ট নির্মাতা, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। ভুক্তভোগীর সম্মতি ও পরিচয় সুরক্ষা, যাচাই ছাড়া দৃশ্য প্রচার না করা এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘনকারী কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও বিপদের দৃশ্য দেখলে প্রথমে সহায়তার উদ্যোগ নিতে হবে, প্রয়োজনে জরুরি সেবা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
মানবিকতা আবেগের প্রদর্শন নয়, দায়িত্বের বাস্তব প্রয়োগ। বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তার মর্যাদা রক্ষা করাই এর প্রকৃত পরীক্ষা। ক্যামেরা হাতে নেওয়ার আগে তাই প্রশ্ন করা জরুরি আমি কি সাহায্য করছি, নাকি কারো দুর্দশাকে আরও মানুষের সামনে মেলে ধরছি? মানুষের বিপদ বিনোদন নয়, অসহায়ত্ব প্রচারের উপকরণও নয়। প্রযুক্তির অগ্রগতি তখনই সার্থক, যখন তা মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। অন্যথায় দর্শক বাড়বে, ভিডিও ভাইরাল হবে; কিন্তু মানবিকতা দর্শকের আসনেই বন্দি থাকবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ