রাজশাহী বিভাগে মৎস্যবিপ্লব: প্রতিদিন ২০ কোটির তাজা মাছ ছড়িয়ে পড়ছে ২৮ জেলায়

Fisheries revolution in Rajshahi division
আবুল কালাম আজাদ ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৩৩ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৩৩ অপরাহ্ন
রাজশাহী বিভাগে মৎস্যবিপ্লব: প্রতিদিন ২০ কোটির তাজা মাছ ছড়িয়ে পড়ছে ২৮ জেলায়
ছবি - বিজয় বাংলা

​ধান কিংবা অন্যান্য প্রথাগত ফসলের একঘেয়ে চাষাবাদ পেছনে ফেলে অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দুয়ার খুলেছে পদ্মাপারের জনপদ রাজশাহীতে। শস্যক্ষেতের বদলে গড়ে ওঠা আধুনিক পুকুর ও বৈপ্লবিক মৎস্য চাষ পদ্ধতি বদলে দিয়েছে এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি। বর্তমানে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলা থেকে প্রতিদিন উৎপাদিত তাজা মাছ পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত ২৮টি জেলায়। বিশেষ প্রযুক্তিতে জ্যান্ত মাছ পরিবহনের এই অভাবনীয় সাফল্যের সুবাদে প্রতিদিন এই অঞ্চলে বেচাকেনা হচ্ছে গড়ে ২০ কোটি টাকারও বেশি মাছ।


​মৎস্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলায় বর্তমানে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৫৩টি পুকুরে মাছ চাষ করছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৬ জন উদ্যোক্তা। পুরো অঞ্চলে বছরে মাছ উৎপাদিত হয় প্রায় ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৪৬৭ মেট্রিক টন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন তাজা মাছের জোগান দেওয়া হচ্ছে দেশের অন্যান্য প্রান্তে।



​এই মৎস্য বিপ্লব কেবল পুষ্টির চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বরং উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি খামারিদের উৎপাদিত মাছ এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।


​সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সনাতন ফসলে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা না পাওয়ায় কৃষকদের বড় একটি অংশ ঝুঁকছেন বাণিজ্যিক মৎস্য চাষের দিকে। বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া জানান, শুরুতে কেবল রাজশাহী জেলায় মিশ্র পদ্ধতিতে চাষাবাদ সীমিত থাকলেও বর্তমানে তা নাটোর, নওগাঁসহ পুরো বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে।


​রুই ও কাতলার পাশাপাশি একই পুকুরে সিলভার কার্প ও দেশি প্রজাতির মাছের সমন্বিত চাষের ফলে জলাশয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকছে। এছাড়া পাবদা, শিং, কই ও মাগুর মাছের মতো উচ্চমূল্যের মাছ চাষ করে খামারিরা আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন। বিশেষ করে এ অঞ্চলের সুস্বাদু পাবদা মাছ নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। খামারিদের দক্ষ করে তুলতে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রতি বছর দেড় হাজারেরও বেশি চাষিকে আধুনিক প্রযুক্তি ও মাননিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।


​প্রায় ২৪ বছর আগে রাজশাহী থেকে দূরদূরান্তে তাজা মাছ পাঠানোর যে অভিনব যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ আধুনিক রূপ নিয়েছে। শুরুর দিকে পানির হাউজে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন সচল রাখতে মানুষের শ্রমের প্রয়োজন হলেও, বর্তমানে ট্রাকে বিশেষ শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে পানির প্রবাহ ও কৃত্রিম অক্সিজেন নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও মাছগুলো সম্পূর্ণ জীবন্ত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছায়।

​প্রতিদিন বিকেল থেকে ভোররাত পর্যন্ত প্রায় ৫০০টিরও বেশি বিশেষায়িত ট্রাক রাজশাহী অঞ্চল থেকে মাছ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যায়। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ৭০০ থেকে ১২০০ কেজি পর্যন্ত মাছ পরিবহন করা হয়। 


পবা উপজেলার পারিলা গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন জানান, সম্প্রতি তিনি এক ট্রাকে ১২০০ কেজি মাছ ঢাকার নিউ মার্কেটে নিয়ে ৩ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। কেবল পারিলা এলাকা থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৫০টি ট্রাক দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।


​রাজশাহীর এই নীরব মৎস্য বিপ্লবের অন্যতম সফল কারিগর দুর্গাপুর উপজেলার উদ্যোক্তা গোলাম সাকলাইন। ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যয়নরত অবস্থায় মাত্র ৭ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ২ বিঘা জমিতে মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। পড়াশোনা শেষ করে করপোরেট চাকরির পেছনে না ছুটে পুরোপুরি এই পেশাকেই বেছে নেন। বর্তমানে তাঁর লিজ নেওয়া খামারের পরিধি প্রায় ১ হাজার বিঘা, যেখানে নিয়মিত কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫২ জন কর্মীর। প্রতিদিন কেবল তাঁর খামার থেকেই ২০টি ট্রাকে করে ঢাকায় মাছ সরবরাহ করা হয়।

​

​অভাবনীয় সাফল্য সত্ত্বেও কিছু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এই খাতের উদ্যোক্তাদের। দুর্গাপুরের খামারি ইদ্রিস আলীসহ স্থানীয় চাষিরা জানান, বাজারে প্রক্রিয়াজাত মাছের খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও সে তুলনায় মাছের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া জ্বালানি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ায় প্রতিটি ট্রাকে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পরিবহন ভাড়া গুনতে হচ্ছে, যা প্রান্তিক খামারিদের লাভের খাতা ছোট করে দিচ্ছে।


​তবে সব বাধা পেরিয়ে গুণগত মান ধরে রেখে দূরদূরান্তে জ্যান্ত মাছ পৌঁছানোর এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে মৎস্য খাতের এই ধারাবাহিক সাফল্য এখন জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখছে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা।