রাজশাহীতে ডেঙ্গুর ভয়ংকর রূপ: ৯ মাসে রামেক হাসপাতালে ২২ জনের মৃত্যু, শীর্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

Dengue fever in Rajshahi is a dangerous disease
আবুল কালাম আজাদ ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ০১:০২ অপরাহ্ন শীর্ষ খবর
আবুল কালাম আজাদ ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ০১:০২ অপরাহ্ন
রাজশাহীতে ডেঙ্গুর ভয়ংকর রূপ: ৯ মাসে রামেক হাসপাতালে ২২ জনের মৃত্যু, শীর্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ
ছবি - বিজয় বাংলা

রাজশাহী অঞ্চলে দিন দিন মহামারী রূপ ধারণ করছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত,  ৯ মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলাতেই মৃত্যুর হার প্রায় ৬৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।


​বুধবার (৪ নভেম্বর) রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা জেলাভিত্তিক ডেঙ্গু মৃত্যুর সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এই চিত্র উঠে এসেছে।

​জেলাভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান ও তুলনামূলক চিত্র

​রামেক হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুতে মৃত ২২ জনের মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থান ও মৃত্যুর হারে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে:

​চাঁপাইনবাবগঞ্জ: মৃত ১০ জন (মোট মৃত্যুর ৪৫.৫%) — তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে জেলাটি। চিকিৎসকদের মতে, এটি অন্য যেকোনো জেলার তুলনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

​রাজশাহী: মৃত ৫ জন (মোট মৃত্যুর ২২.৭%) — মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী জেলা।

​নাটোর ও কুষ্টিয়া: প্রতিটিতে ২ জন করে মোট ৪ জন মারা গেছেন।

​পাবনা, ঝিনাইদহ ও সিরাজগঞ্জ: এই তিন জেলার প্রতিটিতে ১ জন করে মোট ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।


​পরিসংখ্যান বলছে, শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী—এই দুই জেলার রোগীর মৃত্যুর হার মোট মৃত্যুর ৬৮.২ শতাংশ। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মৃত্যুর সংখ্যা একাই রাজশাহীর দ্বিগুণ। এমনকি বাকি ছয়টি জেলার সম্মিলিত মৃত্যুর সংখ্যার (৭ জন) চেয়েও চাঁপাইনবাবগঞ্জে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেশি।


​​বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মোট ১৮৪ জন রোগী। তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

​পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ জানান, "চলতি বছরে এ পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দুটোই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি, আর ৫ জন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী।"


​চাঁপাইনবাবগঞ্জে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক বেশি

হওয়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, "কেন সেখানে মৃত্যুর হার এত বেশি, তা জানতে মাঠপর্যায়ে গিয়ে পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। 


এছাড়া অনেক রোগীই অসচেতনতার কারণে ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না। রোগের একেবারে শেষ পর্যায়ে মুমূর্ষু অবস্থায় তাদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, যার ফলে চিকিৎসকদের চেষ্টার পরও রোগীর জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।"


​মাঠপর্যায়ের প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা জোরদার ও

​পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ মশক নিধন অভিযান ও সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, সেখানে দ্রুত লার্ভিসাইড স্প্রে এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


​স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলেই চলবে না, বরং জনসচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

​জরুরি সতর্কতা হিসেবে যা করণীয়:

​বিলম্ব না করা: সামান্য জ্বর বা ডেঙ্গুর অন্যান্য লক্ষণ দেখা দিলেই অবহেলা না করে দ্রুত রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

​স্বয়ংক্রিয় চিকিৎসা পরিহার: জ্বর হলে ফার্মেসি থেকে নিজে থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ খাওয়া বা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন থেকে বিরত থাকা।

​প্রয়োজনীয় পরীক্ষা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা (NS1 Antigen বা CBC) করানো।

​মশার প্রজনন রোধ: বাসাবাড়ি ও আশপাশের আঙিনায় জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা।