
সারাদেশের ন্যায় রাজশাহীতেও সোমবার (১২ অক্টোবর) নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। র্যালি, আলোচনা সভা ও আনুষ্ঠানিকতার কোনো কমতি ছিল না দিবসটি পালনে। তবে এই ধুমধাম ও ঘটা করে পালন করা আয়োজনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম ও ভীতিকর বাস্তবতা।
রাজশাহীতে থামছেই না কন্যাশিশুদের ওপর পাশবিক ও যৌন নির্যাতনের একের পর এক ঘটনা। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা কিংবা দিনের আলোর ব্যস্ততা—কোথাও নিরাপদ নয় শিশুরা।
গত এক বছরে (অক্টোবর ২০২৫ থেকে অক্টোবর ২০২৬) শুধু রাজশাহী মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন থানা এবং আদালতে জমা হওয়া পরিসংখ্যান বলছে, এই জনপদে প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে কন্যাশিশুরা। ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও অপহরণের মতো পৈশাচিক অপরাধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কোমলমতি শিশুদের শৈশব।
বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য, পুলিশ রেকর্ড ও আদালত সূত্রে পাওয়া গত ১২ মাসের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে দেড়শতাধিক কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে।এর মধ্যে, রাজশাহী জেলা ও মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় এই এক বছরে অন্তত ৪৪টি কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে পবা, বাঘা ও চারঘাট উপজেলায় অপরাধের মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
নগরীর রাজপাড়া, বোয়ালিয়া, মতিহার এবং জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ৩৮টি শিশু ধর্ষণচেষ্টা ও গুরুতর শারীরিক নিগ্রহের শিকার হয়েছে।
এছাড়া, প্রেমের প্রলোভন, অপহরণ কিংবা মানবপাচারের উদ্দেশ্যে ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গত এক বছরে ২৬টি নিখোঁজ ও অপহরণের মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
বাসাবাড়িতে নিয়োজিত শিশু গৃহকর্মীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন এবং পর্নোগ্রাফি ও সাইবার হয়রানির শিকার হয়েছে আরও অন্তত ১৭ জন কন্যাশিশু।
অপরাধের নেপথ্য কারণ ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকরা বলছেন, শিশু নির্যাতন বৃদ্ধির পেছনে মূলত তিনটি বহুমুখী সংকট কাজ করছে,নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার জট থাকায় বিচার পেতে বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়া ও অপরাধীদের জামিনে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি।
তরুণ ও যুবকদের একটি অংশের মধ্যে সর্বনাশা মাদকের আগ্রাসন এবং সাইবার অপরাধের সহজলভ্যতা নৈতিক অবক্ষয় তরান্বিত।
অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ও মাতব্বররা অর্থের বিনিময়ে বা সামাজিক মানসম্মানের দোহাই দিয়ে সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা ।
রাজশাহী জেলা পুলিশ ও মেট্রোপলিটন পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, শিশু নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগ আমলে নিয়ে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, “আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, স্কুল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না করলে এই অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব নয়।”
একদিকে উদযাপনের রঙ, অন্যদিকে ভুক্তভোগী শিশুদের কান্না—রাজশাহীর এই বৈপরীত্য দূর করতে এখন দরকার কথার চেয়ে কাজের প্রতিফলন। সংবেদনশীল এই অপরাধ দমনে এখনই যৌথ ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্ম এক গভীর অন্ধকারের মুখে পড়বে।