
কৃষিতে রাসায়নিক উপকরণের ক্ষতিকর ব্যবহার হ্রাস, কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন এগ্রোইকোলজি ও নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক অ্যাডভোকেসি সভার অংশগ্রহণকারীরা।
আজ রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি গ্রামে বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) ও গ্রিন কোয়ালিশনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত সভায় ৫৬ জন নারী-পুরুষ ও যুব অংশগ্রহণ করেন। সভায় বক্তব্য দেন বারসিক রাজশাহী রিসোর্স সেন্টারের প্রোগ্রাম অফিসার (কৃষি) মো. তৌহিদুল ইসলাম, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান, পবা উপজেলা গ্রিন কোয়ালিশনের সভাপতি ও নারী নেত্রী রহিমা বেগম এবং বারসিকের কমিউনিটি ও ক্যাম্পেইন ফ্যাসিলিটেটর পলি রানীসহ স্থানীয় কৃষক ও যুব প্রতিনিধিরা।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, কৃষি উন্নয়নকে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; মাটির স্বাস্থ্য, পানিসম্পদ, পরিবেশগত ভারসাম্য, প্রাণবৈচিত্র্য এবং মানুষের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য রাসায়নিক সার ও কীটনাশকনির্ভর কৃষির পরিবর্তে স্থানীয় জ্ঞান, দেশীয় বীজ, জৈব সার, প্রাকৃতিক বালাই ব্যবস্থাপনা এবং ফসলের বৈচিত্র্যভিত্তিক এগ্রোইকোলজি চর্চার সম্প্রসারণ প্রয়োজন। তাঁরা এগ্রোইকোলজিকে শুধু কৃষি উৎপাদন পদ্ধতি নয়, বরং পরিবেশগত স্থায়িত্ব, খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি সমন্বিত পথ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি বাস্তবতা তুলে ধরে বক্তারা বলেন, খরা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং রাসায়নিক উপকরণের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এ অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব মোকাবিলায় স্থানীয় জাতের বীজ ও ফসলের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পানি সাশ্রয়ী কৃষি, জৈব উপায়ে মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং কৃষকের অভিজ্ঞতা ও লোকায়ত জ্ঞানের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
নিরাপদ খাদ্য প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বালাইনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা, বাজার তদারকি এবং ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষকদের ন্যায্য মূল্য ও বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সরকারি দপ্তর, স্থানীয় সরকার, কৃষক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে এগ্রোইকোলজি চর্চায় নারী ও তরুণ কৃষকদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
এগ্রোইকোলজির প্রসার ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সভা থেকে নিম্নোক্ত আটটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়- কৃষি নীতিতে এগ্রোইকোলজিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে; রাসায়নিক কীটনাশকের ক্ষতিকর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশকের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে; স্থানীয় জাতের বীজ, কৃষকের বীজ অধিকার ও কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে সরকারি সহায়তা বাড়াতে হবে; এগ্রোইকোলজি চর্চাকারী কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রণোদনা ও বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে; নারী ও যুব কৃষকদের এগ্রোইকোলজি উদ্যোগে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে; উৎপাদন থেকে ভোক্তার থালা পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কার্যকর মনিটরিং ও পরীক্ষাগার সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে; উপজেলা পর্যায়ে কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বাজারে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় অংশীজনদের কার্যকর ভূমিকা এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। তাঁরা মনে করেন, কৃষকের অধিকার, পরিবেশের সুরক্ষা এবং ভোক্তার নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এগ্রোইকোলজিভিত্তিক কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার বিকাশের কোনো বিকল্প নেই।