শতবর্ষী কৃষ্ণচূড়া হারাল রাবি, শূন্য হলো ইতিহাসের এক ছায়াঘেরা অধ্যায়

Rabi loses century-old Krishnachura
আবুল কালাম আজাদ , রাজশাহী:- ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০৩:১৬ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ , রাজশাহী:- ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০৩:১৬ অপরাহ্ন
শতবর্ষী কৃষ্ণচূড়া হারাল রাবি, শূন্য হলো ইতিহাসের এক ছায়াঘেরা অধ্যায়
শুধু একটি গাছ নয়—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসের দীর্ঘ ইতিহাস, প্রকৃতি ও স্মৃতির নীরব সাক্ষী ছিল প্রথম বিজ্ঞান ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী কৃষ্ণচূড়াটি। ছবি - বিজয় বাংলা

শুধু একটি গাছ নয়—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসের দীর্ঘ ইতিহাস, প্রকৃতি ও স্মৃতির নীরব সাক্ষী ছিল প্রথম বিজ্ঞান ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী কৃষ্ণচূড়াটি।

 সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে হঠাৎ গাছটি ভেঙে পড়ে। আগুনরাঙা ফুলে যে গাছটি বছরের পর বছর ক্যাম্পাসকে সাজিয়েছে, শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও দর্শনার্থীদের দিয়েছে ছায়া, সেই পরিচিত দৃশ্য এখন নেই। গাছটি ভেঙে পড়ায় ক্যাম্পাসজুড়ে নেমে এসেছে বিষাদের আবহ।


তবে,গাছটি ঠিক কী কারণে ভেঙে পড়েছে, সেটি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একই সঙ্গে গাছটি ভেঙে পড়ার ঘটনায় কোনো ব্যক্তি বা স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তাও জানা যায়নি। তবে শতবর্ষী একটি গাছ হারানোর ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী গাছগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ঝুঁকি নিরূপণ ও সংরক্ষণে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?



শুধু সৌন্দর্য নয়, পরিবেশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ:-

কৃষ্ণচূড়া মূলত সৌন্দর্যবর্ধক বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। এর বিস্তৃত ডালপালা, ঘন সবুজ পাতা ও উজ্জ্বল লাল-কমলা ফুল শহর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়কের পরিবেশকে নান্দনিক করে তোলে।

একটি বড় গাছের পরিবেশগত গুরুত্ব শুধু ফুল ও সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে কার্বন সঞ্চয়ে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বড় গাছ ছায়া তৈরি করে, আশপাশের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে সহনীয় রাখতে সহায়তা করে এবং পাখি ও বিভিন্ন ছোট প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করতে পারে।

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় সবুজ ক্যাম্পাসে পুরোনো গাছগুলো পরিবেশগত ভারসাম্যের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও পথচারীদের স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই একটি শতবর্ষী গাছ হারানো মানে শুধু একটি বৃক্ষ হারানো নয়; দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা একটি জীবন্ত পরিবেশ-ঐতিহ্যেরও ক্ষতি।


গাছটি না থাকায় কী হারাল রাবি?:-

শতবর্ষী কৃষ্ণচূড়াটি ভেঙে পড়ার পর প্রথমত হারিয়েছে ক্যাম্পাসের একটি পরিচিত দৃশ্য। এর সঙ্গে হারিয়েছে বহু বছরের স্মৃতি। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দর্শনার্থী গাছটির ছায়ায় দাঁড়িয়েছেন, ছবি তুলেছেন কিংবা ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন।


বড় ও পুরোনো গাছের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তারা নতুন লাগানো ছোট গাছের তুলনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশগত ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে একটি শতবর্ষী গাছ ভেঙে পড়ার পর একই জায়গায় নতুন চারা রোপণ করলেও আগের পরিবেশগত অবদান তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ হয় না। নতুন গাছকে বড় হতে আবার বহু বছর সময় দিতে হয়।


একের পর এক পুরোনো গাছ ভেঙে পড়ার ঘটনা:-

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও পুরোনো গাছ ঝড়-বৃষ্টি বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভেঙে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ৬০-৭০ বছরের পুরোনো একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ উপড়ে পড়ার খবর আসে।


জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও টানা বৃষ্টির মধ্যে কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেঙে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। পুরোনো গাছের ক্ষেত্রে দুর্বল শিকড়, কাণ্ডের ভেতরের পচন, রোগবালাই, মাটির অবস্থা কিংবা অতিবৃষ্টির মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণ ঝুঁকি বাড়াতে পারে।


ঐতিহ্যবাহী গাছ সংরক্ষণে উদ্যোগ জরুরি:-

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহাসিক ও সবুজ ক্যাম্পাসে শতবর্ষী বা দীর্ঘদিনের পুরোনো গাছগুলোকে শুধু ‘গাছ’ হিসেবে না দেখে জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচনা করার দাবি উঠছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে ক্যাম্পাসের পুরোনো বড় গাছগুলোর তালিকা তৈরি, বয়স ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শিকড় ও কাণ্ডের ঝুঁকি নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।


একই সঙ্গে ভেঙে পড়া শতবর্ষী কৃষ্ণচূড়াটির স্থানে নতুন কৃষ্ণচূড়ার চারা রোপণের পাশাপাশি গাছটির ইতিহাস সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানতে পারবে—এই জায়গায় একসময় দাঁড়িয়ে ছিল রাবির শতবর্ষী এক কৃষ্ণচূড়া, যার ছায়ায় কেটেছে অসংখ্য মানুষের স্মৃতি।

একটি গাছ পড়ে গেছে, কিন্তু তার সঙ্গে যেন রাবির ইতিহাসের একটি অধ্যায়ও মাটিতে না মিশে যায়—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।