খেতুরীধামে নরোত্তম দাসের তিরোভাব মহোৎসব শুরু : রেল স্টেশনজুড়ে ভক্তের ঢল, ভাড়া-নৈরাজ্যের শিকার পুণ্যার্থীরা
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর ঐতিহাসিক খেতুরীধামে সাড়ম্বরে শুরু হয়েছে সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের মহান সাধক শ্রীশ্রী ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিরোভাব মহোৎসব। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবকে কেন্দ্র করে ধামে ধামে বাজছে হরিনামের ধ্বনি। দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত ও সাধু-সন্ন্যাসীদের আগমনে মুখর হয়ে উঠেছে পদ্মাপাড়ের খেতুরীধাম। তবে উৎসবের আবহে আনন্দের পাশাপাশি রাজশাহীতে আসা হাজার হাজার পুণ্যার্থীকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
আগত ভক্তদের বড় একটি অংশ ট্রেনে চড়ে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাচ্ছেন। পর্যাপ্ত থাকার জায়গা না থাকায় কিংবা যাতায়াতের সুবিধার জন্য বিপুল সংখ্যক যাত্রীকে রাজশাহী রেল স্টেশনেই খোলা আকাশের নিচে বা প্ল্যাটফর্মে রাত যাপন করতে হচ্ছে। ধামে গমন এবং উৎসব শেষে নিজ গন্তব্যে ফেরার পথেও তাঁরা স্টেশনেই সাময়িক আশ্রয় নিচ্ছেন।
পুণ্যার্থীদের এই বিড়ম্বনার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু অটোরিকশা ও সিএনজি চালক এবং পরিবহন ব্যবসায়ী চড়া ভাড়া হাঁকাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী স্টেশন থেকে খেতুরীধামের প্রেমতলী পর্যন্ত যেতে সাধারণ ভাড়ার চেয়ে ক্ষেত্রবিশেষে দশ গুণ পর্যন্ত বেশি ভাড়া দাবি করা হচ্ছে। বাধ্য হয়ে ভক্তরা এই অতিরিক্ত ভাড়া গুণেই গন্তব্যে রওনা হচ্ছেন। উৎসবকে ঘিরে অসাধু পরিবহন সিন্ডিকেটের এমন নৈরাজ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধামে আসা পুণ্যার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় ভজন-কীর্তন, সন্ধ্যা আরতি, দামোদর আরতি, নরোত্তম চরিতকথা ও অধিবাস কীর্তনের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী এ মহোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) উৎসবের দ্বিতীয় দিনে ভোর থেকে মঙ্গল আরতি, হরিনাম সংকীর্তনসহ খেতুরীধাম পরিক্রমা, দর্শন আরতি ও শ্রীল প্রভুপাদ গুরুপূজা অনুষ্ঠিত হয়। দিনভর অষ্টপ্রহর কীর্তন, মহাপ্রসাদ গ্রহণ ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন ভক্তরা। আগামী শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রাতঃকালে গঙ্গাস্নান ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শেষ হবে তিন দিনব্যাপী এই মহোৎসব।
মহোৎসব উপলক্ষে খেতুরীধাম প্রাঙ্গণে বসেছে বিশাল লোকজ মেলা। মেলায় ধর্মীয় উপকরণ ছাড়াও স্থান পেয়েছে নানা ধরনের বাহারি খাবার, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী, কারুশিল্পের পণ্য এবং কামার-কুমারের তৈরি মৃৎ ও লৌহজাত সামগ্রী। আয়োজকরা জানান, এ মেলা মূলত সাধু-সন্ন্যাসীদের মিলনক্ষেত্র হলেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে এখানে সমবেত হন।
খেতুরীধাম ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল বলেন, "শত শত বছর ধরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থাপনায় এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি সব ধর্মের মানুষই সম্প্রীতির টানে এখানে আসেন। ট্রাস্টি বোর্ড ও প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে উৎসব সম্পন্ন করতে কাজ করে যাচ্ছি।"
অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুজন মিয়া জানান, উৎসব প্রাঙ্গণ ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা সার্বক্ষণিক টহল ও দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান জানান, ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে উপজেলা প্রশাসন থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ সার্বক্ষণিক তদারকি ও সহায়তা করছে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুর নরোত্তম দাস ষোড়শ শতকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী এলাকার গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত জমিদার কৃষ্ণনন্দ দাস মজুমদার। অঢেল ধন-সম্পদের মাঝে জন্ম নিয়েও তিনি বিলাসী জীবন ত্যাগ করে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন এবং মানবসেবা ও ধর্মসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। খেতুরীতে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে বৈষ্ণব পদাবলি ও লীলারসকীর্তনের বিকাশে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই প্রতিবছর খেতুরীধামে উদযাপিত হয় এই তিরোভাব মহোৎসব।