সব ‘ফকফকা’, তবুও সবজি,মুদি দোকান ফটোকপির দোকানে ট্রেনের টিকিট
‘অনলাইনে কোনো জালিয়াতি হয়নি, টিকিটিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ফকফকা’—রেলপথ মন্ত্রীর এই এক বাক্যেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে পুরো মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী বেজায় খুশি, রেল কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট, আর পর্দার আড়ালে বিশ্বজয়ের হাসি হাসছে টিকিট কালোবাজারিরা।
মাঝখান থেকে কপাল পুড়ছে সাধারণ যাত্রীদের, যাদের টিকিট পেতে এখন আর রেলের সার্ভারে নয়, ধরনা দিতে হচ্ছে বাসার পাশের ফটোকপির দোকান কিংবা কাঁচা বাজারের সবজি বিক্রেতার কাছে!
উপরতলায় ‘অল ইজ ওয়েল’ থিওরি ঢুকিয়ে দিয়ে নিচে চলছে টিকিটের হরিলুট। রাজধানীর শ্যামলী থেকে শুরু করে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা ও দিনাজপুরের রাজপথ-অলিগলি—সর্বত্রই এখন বাড়তি টাকা ফেললেই মিলছে সোনার হরিণ খ্যাত ট্রেনের টিকিট।যেন দেশজুড়ে কাঁচা বাজার থেকে কম্পিউটারের দোকানে টিকিটের হাট
রাজশাহীঃ টিকিট মিলছে কাঁচা বাজারের তরকারি দোকানেও!
রাজশাহী স্টেশনে সাধারণ মানুষের কপালে টিকিট না জুটলেও কাঁচা বাজারের তরি-তরকারির বিক্রেতা, মুদির দোকানদার কিংবা মোড়ের কম্পিউটারের দোকানে ঠিকই কাঙ্ক্ষিত টিকিট মিলছে। কাউন্টার ও সার্ভারে ‘সিট খালি নেই’ দেখালেও এসব দোকানে কয়েকশত টাকা বাড়তি দিলেই অলৌকিকভাবে বেরিয়ে আসছে ঢাকা কিংবা খুলনাগামী ট্রেনের আসন।
চট্টগ্রামঃ সিআরবি থেকে অলিগলির ট্রাভেল এজেন্সিতে রমরমা ব্যবসা,
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে পাহাড়তলী, সিআরবি ও স্টেশন সংলগ্ন ফুটপাত ছাড়িয়ে টিকিটের কালোবাজারি ছড়িয়ে পড়েছে পাড়া-মহল্লার ফটোকপি ও মোবাইল রিচার্জের দোকানে। বাড়তি ৩০০ থেকে ১,০০০ টাকা দিলেই হাতে চলে আসছে এসি ও শোভন চেয়ারের আসন।
খুলনাঃ ভুয়া অ্যাকাউন্টের সিন্ডিকেট,
কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার অ্যাকাউন্ট বন্ধের বড়াই করলেও খুলনার নিউ মার্কেট ও বড় বাজার এলাকার দালালরা নিত্যনতুন ভুয়া এনআইডি ও সিম ব্যবহার করে ঠিকই সার্ভার ফাঁকা করে দিচ্ছে। সেই টিকিটগুলোই পরে খুচরা দোকানে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।
দিনাজপুরঃ উত্তরাঞ্চলেও টিকিটের আকাল, দালালের কাছে সয়লাব,
দিনাজপুর জংশনে সাধারণ যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে খালি হাতে ফিরলেও স্টেশনের বাইরের ফটোকপি ও ক্যাবল অপারেটরদের দোকানে টিকিটের কোনো অভাব নেই।
‘ফকফকা’ সার্ভার যেভাবে কালোবাজারিদের পকেটে।
রেলমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী "অনলাইনে যে আগে ঢুকবে, সেই টিকিট পাবে।" আর এই সহজ নিয়মকেই নিজেদের মোক্ষম অস্ত্র বানিয়েছে একশ্রেণির প্রযুক্তিভিত্তিক দালাল চক্র।
বট ও হাইস্পিড নেটওয়ার্ক: টিকিট ছাড়ার প্রথম ৩-৪ সেকেন্ডের মধ্যেই বটের (Bot) সাহায্যে হাজার হাজার আসন ব্লক করে ফেলা হয়।
এনআইডি জালিয়াতি: একটি চক্রের কাছে জমা থাকে শত শত ভুয়া এনআইডি ও সিম, যা দিয়ে সহজেই আইডি খুলে টিকিট কেনা হয়।
খুচরা নেটওয়ার্ক: সংগৃহীত এসব টিকিট পরে পৌঁছায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ফটোকপির দোকান, স্টেশনারি ও কাঁচা বাজারের খুচরা বিক্রেতাদের ড্রয়ারে।
তদন্ত কমিটির তথাকথিত ‘ক্লিন চিট’ আর ‘সব ঠিক আছে’ রিপোর্টের তোপে মাঠের বাস্তব সত্য ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এক জায়গায়—যদি সার্ভার সত্যিই ‘ফকফকা’ হয়, তবে শ্যামলীর ফটোকপির দোকান আর রাজশাহীর কাঁচা বাজারের সবজি বিক্রেতার হাতে ট্রেনের টিকিট পৌঁছায় কীভাবে?
রেল প্রশাসনের এই ঢিলেঢালা ভাব আর ওপরতলার অদক্ষতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে, যাত্রীদের পকেট কাটার এই ‘ফকফকা’ উৎসব থামানো অসম্ভব। তথাকথিত কাগজের রিপোর্টের বাইরে এসে মূল বাস্তবতা দেখার সময় কি রেলের কর্তাব্যক্তিদের এখনও হয়নি?