বাসন ধোয়ার স্পঞ্জ থেকে কি আসলেই ক্যানসার হয়, গবেষণা যা বলছে

Do dishwashing sponges really cause cancer
অনলাইন ডেস্ক ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ১১:১৬ পূর্বাহ্ন লাইফস্টাইল
অনলাইন ডেস্ক ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ১১:১৬ পূর্বাহ্ন
বাসন ধোয়ার স্পঞ্জ থেকে কি আসলেই ক্যানসার হয়, গবেষণা যা বলছে
সংগৃহীত ছবি

রান্নাঘরের প্রতিদিনের কাজে বাসন ধোয়ার স্পঞ্জ ও ধাতব মাজুনি প্রায় অপরিহার্য। থালাবাসনের তেল, চর্বি কিংবা হাঁড়িতে লেগে থাকা পোড়া দাগ তুলতে এগুলোর জুড়ি নেই। কিন্তু সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, এসব সরঞ্জাম ব্যবহারে নাকি ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এমন দাবি শুনে অনেকেই উদ্বিগ্ন। প্রতিদিন খাবারের পাত্র পরিষ্কার করতে যে জিনিস ব্যবহার করা হয়, সেটিই যদি স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে গবেষণা আসলে কী বলছে?


স্পঞ্জে জীবাণু জমার আশঙ্কা বেশি


বাসন ধোয়ার স্পঞ্জ সাধারণত নরম, ছিদ্রযুক্ত এবং দীর্ঘ সময় ভেজা থাকে। খাবারের উচ্ছিষ্ট ও পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে এর ভেতরে ব্যাকটেরিয়া জমে বংশবিস্তার করতে পারে। বিশেষ করে ব্যবহারের পর ঠিকমতো পরিষ্কার ও শুকানো না হলে জীবাণুর পরিমাণ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে স্পঞ্জে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেলেই সেটি ক্যানসার সৃষ্টি করে, এমন নয়। এখন পর্যন্ত সাধারণ রান্নাঘরের স্পঞ্জ ব্যবহারের সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি। বরং অপরিষ্কার স্পঞ্জের মাধ্যমে ক্ষতিকর জীবাণু খাবার, থালাবাসন কিংবা রান্নাঘরের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিই বেশি।


২০২২ সালে ‘জার্নাল অব অ্যাপ্লায়েড মাইক্রোবায়োলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় নরওয়ে ও পর্তুগালের গবেষকেরা ব্যবহৃত বাসন ধোয়ার স্পঞ্জ ও ব্রাশ পরীক্ষা করেন। এতে স্পঞ্জে অ্যাসিনেটোব্যাকটার ও সিউডোমোনাসসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, স্পঞ্জের তুলনায় বাসন ধোয়ার ব্রাশে সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কম। এর একটি কারণ হতে পারে, ব্রাশ তুলনামূলক দ্রুত শুকিয়ে যায়। ফলে কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার টিকে থাকার সুযোগ কমে। তবে এই গবেষণায় ধাতব মাজুনি পরীক্ষা করা হয়নি। তাই ব্রাশের ফলাফল মাজুনির ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা ঠিক হবে না।

স্পঞ্জ থেকে বের হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক?

স্পঞ্জ নিয়ে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক। কিছু সিনথেটিক স্পঞ্জ ব্যবহারের সময় ঘর্ষণ ও ক্ষয়ের কারণে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ছাড়তে পারে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ‘এনভায়রনমেন্টাল অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ বিষয়টি উঠে এসেছে। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা স্পঞ্জ ব্যবহারের সময় মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গমনের বিষয়টি পরীক্ষা করেন।


পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। পরিবেশে এসব কণা ছড়িয়ে পড়তে পারে। মানুষের শরীরে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। তবে স্পঞ্জ থেকে বের হওয়া কণা বাসনের মাধ্যমে মানুষের শরীরে কতটা প্রবেশ করে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এসব কণার কারণে ক্যানসার হয়, এমন প্রমাণও ওই গবেষণায় পাওয়া যায়নি।

২০২৫ সালে ইউরোপীয় খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের জন্য তৈরি একটি গবেষণা পর্যালোচনাতেও খাদ্যস্পর্শী বিভিন্ন উপকরণ থেকে ঘর্ষণের ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গমনের বিষয়টি উঠে আসে। তবে মানুষের শরীরে এর প্রকৃত সংস্পর্শের মাত্রা নির্ধারণের মতো তথ্য এখনো সীমিত।


ধাতব মাজুনি কি বিপজ্জনক?

হাঁড়ি-পাতিলের শক্ত ময়লা পরিষ্কারে স্টিলের তার বা ধাতব তন্তু দিয়ে তৈরি মাজুনি ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারে কিংবা অতিরিক্ত চাপ দিয়ে ঘষলে এর সরু তার ছিঁড়ে যেতে পারে। সেই তন্তু বাসনে আটকে থাকলে খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। ধারালো ধাতব অংশ শরীরের ভেতরে গেলে আঘাতের ঝুঁকিও রয়েছে।

তবে এই আশঙ্কাকে ক্যানসারের ঝুঁকি বলে ধরে নেওয়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সাধারণভাবে ধাতব মাজুনি ব্যবহারে ক্যানসার হয়, এমন সরাসরি নির্ভরযোগ্য গবেষণাও পাওয়া যায়নি। এখানে মাজুনির উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ। স্টেইনলেস স্টিল, সাধারণ স্টিল কিংবা প্লাস্টিকের আঁশ দিয়ে তৈরি স্ক্রাবারের বৈশিষ্ট্য এক নয়। তাই সব ধরনের মাজুনিকে একই ধরনের ঝুঁকির আওতায় ফেলা উচিত হবে না।


অপরিষ্কার স্পঞ্জে কী সমস্যা হতে পারে?

স্পঞ্জের মাধ্যমে জীবাণু ছড়িয়ে পড়া একটি বাস্তব উদ্বেগ। কাঁচা মাছ বা মাংসের রস পরিষ্কার করার পর একই স্পঞ্জ দিয়ে থালাবাসন ধুলে জীবাণু অন্য জায়গায় ছড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে খাদ্যবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।


যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিদর্শন বিভাগও রান্নাঘরের স্পঞ্জকে জীবাণুর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছে। শুধু গরম করা বা ফুটিয়ে নিলেই স্পঞ্জের সব জীবাণু দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

২০২৬ সালে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন মাইক্রোবায়োলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় ব্যবহৃত ৯৮টি রান্নাঘরের স্পঞ্জ পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা দেখেন, বাইরে থেকে পরিষ্কার মনে হলেও স্পঞ্জের মধ্যে জীবাণু থাকতে পারে। অর্থাৎ শুধু চোখে দেখে স্পঞ্জের পরিচ্ছন্নতা বোঝা সম্ভব নয়।

স্পঞ্জ ও মাজুনি ব্যবহারে সতর্কতা

রান্নাঘরের এসব সরঞ্জাম ব্যবহারে কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তুললে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমানো যায়।


বাসন ধোয়ার পর স্পঞ্জ ও মাজুনি ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে খাবারের উচ্ছিষ্ট সরিয়ে ফেলুন।

ব্যবহারের পর ভেজা স্পঞ্জ সিঙ্কে ফেলে রাখবেন না। পানি ঝরিয়ে বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় শুকাতে দিন।

স্পঞ্জে দুর্গন্ধ, অতিরিক্ত ময়লা বা ক্ষয়ের লক্ষণ দেখা দিলে বদলে ফেলুন।

কাঁচা মাছ-মাংসের রস পরিষ্কারের জন্য আলাদা সরঞ্জাম ব্যবহার করুন।

ধাতব মাজুনির তার খুলে এলে সেটি আর ব্যবহার করবেন না। বাসনে কোনো তন্তু আটকে আছে কি না, দেখে নিন।

ননস্টিক বা সহজে আঁচড় পড়ে এমন পাত্রে ধাতব মাজুনি ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।

সম্ভব হলে দ্রুত শুকিয়ে যায় এমন বাসন ধোয়ার ব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন।

স্পঞ্জ পরিষ্কারে মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়। তবে সব স্পঞ্জ মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের উপযোগী নয়। ধাতব অংশযুক্ত স্পঞ্জ কখনোই মাইক্রোওয়েভে দেওয়া উচিত নয়। তাই স্পঞ্জ জীবাণুমুক্ত করার ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেটি বদলে ফেলুন।

তাহলে কি ব্যবহার বন্ধ করবেন?

বর্তমান গবেষণার ভিত্তিতে বাসন ধোয়ার স্পঞ্জ বা ধাতব মাজুনি ব্যবহারে ক্যানসার হয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। স্পঞ্জে জীবাণু জমতে পারে, কিছু সিনথেটিক স্পঞ্জ থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বের হতে পারে এবং ধাতব মাজুনি ক্ষয়ে গিয়ে ছোট তন্তু ছাড়তে পারে। তবে এগুলো ভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়।


তাই আতঙ্কিত হয়ে স্পঞ্জ বা মাজুনি ব্যবহার বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ব্যবহারের পর ভালোভাবে শুকানো এবং ক্ষয়ে গেলে সরঞ্জাম বদলে ফেলার মতো সতর্কতাই বেশি জরুরি।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া