পদ্মার পানি বাড়ছেঃ ভাঙন, আবাসন ও খাদ্যসংকটে চরবাসী—শেষ সম্বল গবাদিপশুও অনিরাপদ

Padma water is rising
আবুল কালাম আজাদ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:১১ পূর্বাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:১১ পূর্বাহ্ন
পদ্মার পানি বাড়ছেঃ ভাঙন, আবাসন ও খাদ্যসংকটে চরবাসী—শেষ সম্বল গবাদিপশুও অনিরাপদ
পদ্মার পানি বাড়ায় চরাঞ্চল থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শহরের সড়কে গবাদিপশুর পাল। রাজশাহীর একটি সড়কে এমন দৃশ্য দেখা যায়।ছবি - বিজয় বাংলা

একদিকে বাড়ছে পদ্মার পানি, অন্যদিকে নদীভাঙনের আতঙ্ক। পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে চরাঞ্চলের ঘরবাড়ি, ফসলের জমি ও গবাদিপশুর চারণভূমি। 

কোথাও বসতভিটায় পানি ঢুকেছে, কোথাও ভাঙনে ঘর হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে পরিবার। নিজেদের খাবার ও থাকার জায়গার সংকটের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে গবাদিপশু নিয়ে।

চারণভূমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মিলছে না ঘাস-খড়:- ঘরবাড়িতে পানি ঢোকায় গরু-মহিষ রাখার জায়গাও নেই। ফলে জীবন ও শেষ সম্বল গবাদিপশু বাঁচাতে চর ছেড়ে নদীর এপারে আসছেন মানুষ। আশ্রয়ের জায়গা না পেয়ে অনেকে গবাদিপশু নিয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক ও বাঁধের আশপাশে অবস্থান করছেন।

রাজশাহী শহরের একটি সড়কে গবাদিপশুর এমন বিশাল পাল এখন সেই দুর্ভোগেরই দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি। রাস্তার ওপর দিয়ে একসঙ্গে চলাচল করছে শত শত গরু। খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চর থেকে নিয়ে আসা এসব পশুর মালিকদেরও দেখা যাচ্ছে আশপাশে। ব্যস্ত সড়কে গবাদিপশুর এমন উপস্থিতিতে যান চলাচলেও তৈরি হচ্ছে ভোগান্তি।

বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে পদ্মা:-

রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি ১৭ দশমিক ২০ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র শূন্য দশমিক ৮৫ মিটার নিচ দিয়ে বইছে নদীর পানি।

পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর দক্ষিণ পাড়ের চরখিদিরপুর, খানপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু এলাকায় পানি ঢুকছে। এরই মধ্যে অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বাড়িঘরের চারপাশে পানি জমে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, উজান থেকে পানি আসায় পদ্মার পানি বাড়ছে। পানি আরও বাড়লে চরাঞ্চলের পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভাঙনে সর্বস্বান্ত, নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য নেই

চরবাসীর দুর্ভোগ শুধু পানিতে সীমাবদ্ধ নয়। নদীভাঙন তাদের দীর্ঘদিনের আরেক আতঙ্ক। ভাঙনে বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর অনেকেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। কারও ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে, কারও ঘর ভাঙনের মুখে।

বসতভিটা হারানোর পর নতুন করে ঘর তৈরি করাও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক পরিবারের সঞ্চয় বলতে যা ছিল, তা গবাদিপশু। সেই গবাদিপশু নিয়েও এখন নিরাপদ জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

গবাদিপশুর তীব্র খাদ্যসংকট :-

চরাঞ্চলের বহু পরিবারের জীবিকা গবাদিপশু পালন ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বন্যার পানিতে চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় গরু-মহিষের খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

চরবাসীদের আশঙ্কা, পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে গোখাদ্যের সংকট আরও তীব্র হবে। ভেজা পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকলে গবাদিপশুর নানা রোগেও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফলে নিজেদের জন্য চাল-ডাল বা শুকনো খাবারের পাশাপাশি এখন তাদের চিন্তা করতে হচ্ছে গরু-মহিষের খাবার নিয়েও। অনেকেই বাধ্য হয়ে গবাদিপশু নিয়ে শহরের দিকে চলে আসছেন।

বানভাসি মানুষ গবাদি পশুর আশ্রয় শহরের রাস্তায় :-

চরাঞ্চলে থাকার জায়গা নেই, চারণভূমি নেই। তাই শহরের রাস্তা ও বাঁধের আশপাশই অনেকের কাছে সাময়িক আশ্রয়ের জায়গা হয়ে উঠেছে।

কিন্তু শহরে এসেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। গবাদিপশুর জন্য পর্যাপ্ত খাবার নেই, নেই ছাউনি বা নিরাপদ রাখার জায়গা। ফলে দিনের বড় সময় গরুগুলোকে সড়ক ও আশপাশের এলাকায় ঘুরতে হচ্ছে।মানুষের নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, অথচ বাঁচাতে হবে শেষ সম্বল গরুগুলোকেও।

মানুষের -পশুরও খাদ্য ও আশ্রয়ের জরুরী  প্রয়োজন :-

চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য এখন জরুরি হয়ে পড়েছে নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও চিকিৎসা। একই সঙ্গে গবাদিপশুর জন্য খড়, ঘাসসহ প্রয়োজনীয় গোখাদ্য ও নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

স্থানীয়রা বলছেন, শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই হবে না; ভাঙনে বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং গবাদিপশু রক্ষায়ও দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

শহর রক্ষা বাঁধ নিয়ে আপাতত ঝুঁকি নেই:-

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানিয়েছেন, পদ্মার পানি বাড়লেও আপাতত শহর রক্ষা বাঁধ নিয়ে ঝুঁকি নেই। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কোনো স্থানে ঝুঁকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

তবে চরবাসীর ভয় অন্য জায়গায়—পানি আরও বাড়লে ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি ভাঙন শুরু হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তখন নতুন করে বহু পরিবার বসতভিটা হারাতে পারে।

পদ্মার পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। কিন্তু চরবাসীর জীবনে দুর্যোগ ইতোমধ্যেই নেমে এসেছে। পানিতে ডুবে যাচ্ছে ঘর ও চারণভূমি, ভাঙনে হারাচ্ছেন বসতভিটা, আর আশ্রয়ের খোঁজে শহরের রাস্তায় চলে আসছে গবাদিপশুর পাল। নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাই শুধু বাঁধের নিরাপত্তা নয়—চরাঞ্চলের মানুষ ও তাদের শেষ সম্বল গবাদিপশু বাঁচানোও এখন বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ।